ইউক্রেনে দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুললে চাকরিচ্যুতের হুমকি

‘১৩ দিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলব না কোনোদিন। মনে হচ্ছে নতুন এক জীবন পেয়েছি। আর কখনও নাবিকের পেশায় ফিরব কিনা তা নিয়ে ভাববো নতুন করে। এর বেশি কিছু বলতে পারব না। ওপর থেকে বারণ করা আছে।’-এমনটি বলে নিজের নামটিও প্রকাশ না করতে অনুরোধ করলেন এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের এক নাবিক। গণমাধ্যমকে এড়াতে আত্মীয়স্বজনের বাসায় বাসায় থাকছেন বলে জানান তিনি। শুধু এই নাবিকই নন, মুখে কুলুপ এঁটেছেন ইউক্রেন থেকে ফেরা প্রায় সব নাবিক। কেউ যেন তাদের মুখে লাগিয়ে দিয়েছেন তালা।

ওয়ার জোন ঘোষিত ইউক্রেন সমুদ্রসীমায় তারা যেতে চেয়েছিলেন কিনা? সেখানে যেতে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়েছিল কিনা? দুঃসহ ১৩ দিন তাদের কীভাবে কেটেছে? আটকে পড়ার পর কর্তৃপক্ষের কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন? মৃত্যু উপত্যকা ছাড়তে তাদের সাত দিনের আকুতি কেন শোনা হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তরে নীরব থেকেছেন তারা। এসব বললে কেউ কেউ চাকরি হারানোর আশঙ্কার কথাও সরাসরি জানিয়েছেন। গণমাধ্যমকর্মীদের এড়াতে কয়েকজন চলে গেছেন আত্মগোপনেও। রাতে ভাইয়ের বাসায় উঠলেও সকালে গিয়ে আর পাওয়া যায়নি নাবিক হোসাইন মোহাম্মদ রাকিবকে। কোথায় আছেন সেটাও বলতে নারাজ তার স্বজনরা। প্রধান প্রকৌশলী ওমর ফারুক তুহিনকেও পাওয়া যায়নি খুলশীর ঠিকানায়। দিনভর তিনি বন্ধ রেখেছেন তার মোবাইল ফোনটিও।

সন্তানের দুই মুখে চারটি চুমো এঁকে দিয়েই ছুটলেন জামাল ইউক্রেন থেকে ফেরার পর স্বজনদের সঙ্গেও স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে পারেননি নাবিকরা। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর থেকে তাদের ঘিরে নিরাপত্তার বলয় তৈরি করা হয়। ছিলেন নজরদারিতেও। একই চিত্র ছিল চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। বাবা জামাল উদ্দিনকে বরণ করতে বিমানবন্দরে এসেছিল ছেলে ওয়াসি। সন্তানকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি। সেখানেও কিসের যেন তাড়া। সন্তানের দুই মুখে চারটি চুমো এঁকে দিয়েই তাড়াহুড়ো করে গাড়ির জন্য ছুটতে থাকেন তিনি। ৫৫ বছর বয়সী ওবায়দুল হক বিমানবন্দরে এসেছিলেন ছেলে মোতাসিম বিল্লাকে বরণ করতে। কিন্তু প্রাণভরে সন্তানকে জড়িয়ে ধরতে পারেননি তিনিও। স্বামী জামাল হোসেনকে এক নজর দেখতে বিমানবন্দরে ছুটে আসেন স্ত্রী শামীমা আক্তার। তিনিও স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পারেননি প্রাণ খুলে। বাঁশির হুইসেল ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন নাবিকদের দ্রুত বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে তুলে দেন। রাকিবের বড় ভাই হৃদয় বিমানবন্দরেই যাননি। বুধবার রাতে তিনি বললেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে বিমানবন্দরে কেউ কথা বলতে পারবে না। রাকিবকে গাড়িতে করে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে।’ বিমানবন্দরে নাবিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে শুধু বলেছেন দুটি বাক্য। ‘সুস্থ আছি, ভালো আছি।’ কেউ কেউ আরেকটি বাক্য বলেছেন- ‘আতঙ্কে ছিলাম খুব।’

গণমাধ্যমকে কেন এড়িয়ে চলছেন নাবিকরা মৃত্যু উপত্যকা থেকে ফেরা নাবিকদের অভিজ্ঞতা ও নানা মতামত জানতে গণমাধ্যম কর্মীরা ছুটছেন তাদের কাছে। কিন্তু গতকাল দিনভর তাদের কারও দেখা মেলেনি। যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তারাও নাম প্রকাশ করে মুখ খুলতে নারাজ। কেন গণমাধ্যমকে এভাবে এড়িয়ে চলছেন নাবিকরা? এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘সত্য লুকাতেই এমন লুকোচুরি করা হচ্ছে। নাবিকদের মুখ খুলতে বারণ করা হয়েছে। তারা যদি সত্য বলেন তাহলে বেকায়দায় পড়বে কর্তৃপক্ষ। মুখোশ উন্মোচন হবে অনেকের। এটি বুঝতে পেরে তাদের ভয় দেখানো হয়েছে। কথা বলতে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। আমরাও নাবিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি নানাভাবে। কিন্তু অজানা এক ভয় তাড়া করছে তাদের।’ সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘নাবিকরা দুঃসময় কীভাবে কাটিয়েছে এটি জানতে চাওয়াটা স্বাভাবিক। তাদের উদ্ধারে কার কী ভূমিকা ছিল সেটিও তাদের মুখ থেকে শুনতে চায় সাধারণ মানুষ। এখানে বিধিনিষেধ দিল কারা।’

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের উপ-মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং ও পরিকল্পনা) মো. মুজিবুর রহমানের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে বুধবার রাতে তিনি সমকালকে বলেন, ‘২৮ নাবিকের সবাই নিরাপদে দেশে ফিরেছেন। এটিই এখন সবচেয়ে বড় সুখবর। হাদিসুরের লাশ কীভাবে দেশে আনা যায় এখন আমরা ব্যস্ত আছি তা নিয়ে।’

ডব্লিউজি/এমএ

Leave a Reply