বড় হচ্ছে টিসিবি’র লাইন, চাপের মুখে সরকার?

দিনের পর দিন দেশের বাজার পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠছে। লাগাম টেনে ধরাই যেনো হয়ে গেছে মুশকিল। দিনের ব্যবধানের বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনী পণ্যের দাম। এমন কোনো পণ্য নেই যেটা মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে আছে। পেঁয়াজের ঝাঁঝে ক্রেতাদের চোখে পানি আসছে আর সয়াবিন তেলের বাজার চড়া হতে হতে এখন ধরাছোয়ার বাইরে। শুধু যে দামের দিক থেকে ধরাছোয়ার বাইরে তাই নয়, আসলেই বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে আলুর দাম। স্বস্তি নেই চাল বা সবজির বাজারেও। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এসব পণ্যের দামও। নিয়ন্ত্রণহীন এ দামের ফলে নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে ক্রেতাদের। এমন অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ।

এ অবস্থায় যে দিশেহারা শুধু সাধারণ মানুষ, সেটা বললেও ভুল হবে। দিশেহারা সরকারও। দ্রব্যমূল্য ইস্যুতেই চাপের মুখে পড়েছে সরকার। মানুষ দ্রব্যমূল্য নিয়ে এখন প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করেছে। আর অস্বস্তি থেকে মানুষ ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে যে, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে, এই পরিস্থিতি চলতে পারে না। এরকম পরিস্থিতিতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) থেকে স্বল্পমূল্যে মানসম্মত পণ্য কিনতে মানুষের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে ভোর থেকে মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছেন পণ্য কিনতে। সকাল ১০টায় পণ্য বিক্রি শুরু করে বেলা আড়াইটা বাজলেও শেষ হয় না মানুষের লাইন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্নবিত্তের পাশাপাশি এখন মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে টিসিবির লাইনে। অধিকাংশ মানুষ টিসিবি থেকে কিনছেন সয়াবিন তেল ও পিঁয়াজ। চাল, ডাল, তেল, চিনি, পিঁয়াজসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের বাজার চড়া। রাজধানীর ১৫০টি স্পটে ট্রাকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপণ্য বিক্রি শুরু করেছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এ দফায় বিক্রয় কার্যক্রম ৬ মার্চ শুরু হয়ে ২৪ মার্চ পর্যন্ত চলবে। পরে ২৭ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ফের পণ্য বিক্রি করা হবে। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন বিক্রি হবে টিসিবির পণ্য। টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা দিনে ৫৫ টাকা কেজি দরে সর্বোচ্চ ২ কেজি চিনি, ৬৫ টাকা কেজি দরে ২ কেজি মসুর ডাল, ১১০ টাকা দরে ২ লিটার সয়াবিন তেল ও ৩০ টাকা দরে আড়াই কেজি পিঁয়াজ কিনতে পারবেন। দেশব্যাপী ৪০০-৪৫০ জন ডিলারের ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে এ বিক্রি কার্যক্রম চলবে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যা করা উচিত তা করা হচ্ছে না বলেই সাধারণ মানুষ মনে করছে। বিশেষ করে মন্ত্রীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে। গত সপ্তাহেও লাফিয়ে লাফিয়ে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। এ সপ্তাহেও বাড়ছে। জিনিসপত্রের দাম এমন পরিস্থিতিতে চলে গেছে যে, নিম্নআয়ের মানুষ তো বটেই উচ্চ মধ্যবিত্তের জন্য বাজার-সদাই করা একটা চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণেই তারা টিসিবির লাইনে ভিড় করছে। তারা কিছুতেই তাদের আয়ের সাথে ব্যয় মিলাতে পারছেন না বলেই এটা করছে। সাধারণ মানুষ এই সমস্ত ঘটনার জন্য একসময় ছোটখাটো অস্বস্তি প্রকাশ করলেও এখন মুখ ফুটে কথা বলা শুরু করেছে, এজন্য দায়ী করছে সরকারকে। বাণিজ্যমন্ত্রী দ্রব্যমূল্য নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন, হুঁশিয়ারি-সাবধানী করছেন কিন্তু তার কথা কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। বাজারের ওপর সরকারের কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ নেই বলেই মনে করছেন সাধারণ মানুষ। আর কেউ কেউ মনে করছেন সরকারের মন্ত্রীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। রাজধানীতে টিসিবির বিভিন্ন পয়েন্টে ক্রেতার উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে আসা অনেকেই ফিরছেন খালি হাতে। রামপুরা ব্রিজ এলাকায় টিসিবির পণ্য নিতে এসেছেন তসলিম হোসেন (৬২)। দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ২ কেজি ডাল, ২ কেজি চিনি আর ২ লিটার তেল কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করে। ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া দিয়ে দুই ছেলেকে পড়াশোনার খরচ জুগিয়ে ছয়জনের সংসারে ভীষন টানাপোড়েন। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম হুহু করে বাড়ছে। কোনো উপায় না পেয়ে ছেলেকে না জানিয়ে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়েছি। এরকম চিত্র অহরহ ঘটছে। যারা কোনো সময় টিসিবির লাইনে দাঁড়ায়নি তারাও এখন লাইনে দাঁড়াচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকে ক্রেতাই প্রশ্ন তুলছেন যে, এখনই এই অবস্থা তাহলে রোজায় কি হবে? ক্রেতারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে সরকারকে আশু পদক্ষেপ নিতে বলছেন। নইলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডব্লিউজি/এমএ

Leave a Reply